শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

রাজধানীর তিন বড় বস্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : মার্চ ২৮, ২০২৬, ১২:৩০ পিএম

রাজধানীর তিন বড় বস্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা

রাজধানীর তিন বড় বস্তি—সাততলা, কড়াইল ও ভাসানটেকের বাসিন্দাদের জন্য বহুতল ভবন, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও হাসপাতাল নির্মাণের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। সেই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ভিত্তিতে করা হবে বস্তিবাসীর তালিকা, যেন প্রকৃত ব্যক্তিরাই এর সুবিধা পায়।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি একটি সভা করে সিটি করপোরেশন। সাততলা, ভাসানটেক ও কড়াইল বস্তির জন্য একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয় ওই সভায়। বস্তিবাসীর জন্য পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিতকে গুরুত্ব দেয়া হবে মহাপরিকল্পনায়। তার জন্য পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ; সড়ক, মসজিদ-মাদরাসা, স্কুল-কলেজ, বাজার, হাসপাতালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পুরো এ কার্যক্রমটি ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলবে বলে সভায় জানানো হয়।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের (বিএনপি) নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল বস্তিবাসীকে উন্নত জীবন ও মানসম্মত আবাসন দেয়ার। সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই আমরা সাততলা, ভাসানটেক ও কড়াইল বস্তির জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে এ বিষয়ে আমাদের একটি সভা হয়। সেখানে আমরা কী করব, কী প্রক্রিয়ায় করব সে বিষয়েও প্রাথমিক আলাপগুলো সেরে ফেলেছি।’

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রকৃত বস্তিবাসী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা হবে। এনআইডিতে যাদের ঠিকানা বস্তি উল্লেখ থাকবে তাদেরকেই প্রকৃত বস্তিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে বলে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর এ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রশাসক।

বস্তিবাসীদের কেউ কেউ বস্তির জায়গায় ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি রয়েছে বলে দাবি করেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ কাগজ চাওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বস্তি সাধারণত সরকারি জমিই। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকার দাবি করে থাকে। আমরা তাদের কাছে কাগজপত্র চাইব। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করব।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বস্তিবাসীর জন্য আবাসনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত বস্তিবাসী যাচাই করা। বিশেষ করে ঢাকার মতো বস্তিগুলোয় প্রতিনিয়তই মানুষ ঢুকছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ডিএনসিসিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সংস্থাটি যেহেতু বলছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে প্রকৃত বস্তিবাসী শনাক্ত করবে, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের পাশাপাশি বায়োমেট্রিক পদ্ধতির মাধ্যমেও প্রকৃত বস্তিবাসী শনাক্তের পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বস্তিবাসী যে অবস্থায় বসবাস করছে তারা আসলে কোনো নাগরিক সেবাই সঠিকভাবে পাচ্ছে না। সভ্য দেশে এভাবে মানুষ বসবাস করে না। তাদের পুনর্বাসনের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে আমরা তার সমর্থন করি। তবে অতীতে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের নামে যে ভুলগুলো হয়েছে, সেগুলোর যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।’

বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে বহুতল আবাসন নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই তাদের জন্য মৌলিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি বলে মনে করেন অনেক নগর পরিকল্পনাবিদ। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, নিরাপদ পানীয় জল এবং অগ্নিনিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিত করা। তাদের মতে, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বস্তিবাসীদের জন্য দুই বা তিন তলাবিশিষ্ট সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তোলা অধিক কার্যকর হতে পারে। কারণ উচ্চতল ভবনের পরিকল্পনা অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল, জটিল এবং বাস্তবায়ন-অযোগ্য হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টেকসই সমাধান মানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। আর সেটি সম্ভব হবে তখনই, যখন বস্তিবাসীরা তাদের বর্তমান অবস্থানেই প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা পাবে এবং নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে পারবে।’

এর আগে ভাসানটেক বস্তিতে বস্তিবাসীর জন্য আবাসন নির্মাণ করেছিল সরকার। কিন্তু সে আবাসনগুলো বস্তিবাসীর উপযোগী না হওয়ায় সেখানে বসবাস করা সম্ভব হয়নি তাদের। এ প্রসঙ্গে নগরসংশ্লিষ্টরা বলেন, সরকার বস্তিবাসীর জন্য আবাসনের কথা বলে শুরুতে ছোট ছোট ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা করে। সে পরিকল্পনা পাস হলে একেবারে শেষে গিয়ে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে ফ্ল্যাটের আকার বড় করে ফেলা হয়। অথচ এত বড় ফ্ল্যাটে থাকার সামর্থ্য বস্তিবাসীর থাকে না। তখন তারা ওই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে আবার নতুন বস্তিতে গিয়ে বসবাস করে।

বস্তিবাসীর জন্য তাই ৪০০ থেকে ১০০০ স্কয়ার ফিটের নিচে বাসা নির্মাণ করতে হবে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। আর এখানে বহুতল ভবন মানে কত তলা ভবন হবে সেটাও দেখতে হবে। যদি ১০ বা ২০ তলা ভবন হয়, ওই ভবনের সার্ভিস চার্জ তো বস্তিবাসীর পক্ষে দেয়া সম্ভব হবে না। আবার ফ্ল্যাট তাদের দিতে হবে ভাড়াভিত্তিক। নয়তো এককালীন টাকা দেয়া কিংবা ফ্ল্যাট মূল্য দেয়া বস্তিবাসীর জন্য সহজ হবে না।

 

Link copied!