বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬

ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অন্তত ২০০, আবারও বেপরোয়া পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : মার্চ ২৫, ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম

ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অন্তত ২০০, আবারও বেপরোয়া পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা

এবার ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২০০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একইসাথে যাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে বাড়তি ছুটি ঘোষণা করা হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সড়কে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ছুটি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল, চালকের ক্লান্তি ও বেপরোয়া গতি পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতিকেও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সাংবাদিকদের বলেন, এবারের ঈদুল ফিতরের যাত্রায় চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। বাসে ভাড়া নৈরাজ্য থাকলেও সরকার তা স্বীকার করেনি। কোনো বাস মালিককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে- এমন তথ্য নেই। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোতে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করেনি।

তিনি বলেন, রেল দুর্ঘটনা, লাইনচ্যুতি এবং জামালপুরে ভাসমান সেতু ভেঙে পড়া দায়িত্বে অবহেলার চিত্র। বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালকদের কারণে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এসব সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন, না হলে সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনা কমবে না। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিবহণচালক ও মালিকদের ওপর চাপ থাকায় নৈরাজ্য কম ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের প্রতি সহনশীলতা দেখানোয় তারা আবার বেপরোয়া হয়েছে এবং গা-ছাড়া ভাব বেড়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ছুটি বাড়ানো ইতিবাচক হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে উন্নতি হয়নি। দুর্ঘটনা ও হতাহতের কারণে যাত্রা বিষাদময় হয়েছে। তিনি বলেন, এ বছর সড়ক, নৌ ও রেলপথে বিশৃঙ্খলা বেশি ছিল। কমলাপুর থেকে যাত্রীরা ট্রেনের ছাদে উঠেছে, বগুড়ায় ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে এবং কুমিল্লায় গেটম্যান না থাকার ঘটনা দায়িত্বে অবহেলার উদাহরণ। সদরঘাটে লঞ্চে উঠতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে পানিতে পড়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।

তিনি বলেন, রেল, লঞ্চ ও সড়কপথে ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস রুট রেশনালাইজেশন ও ব্রিজে ইলেকট্রনিক টোল সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সমাধান না করলে দুর্ঘটনা কমবে না।

এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। তাদের হিসাবে, এবারের ঈদযাত্রায় সোমবার পর্যন্ত ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৬ জন নিহত এবং ৪২১ জন আহত হয়েছেন। ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে এক সপ্তাহে ১ হাজার ৬২১ জন ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৭৮ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবং ৩১৫ জন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার। গত ৯ বছরে ঈদুল ফিতরে ২ হাজার ৬৯২টি দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৩৬ জন নিহত এবং ৮ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ১২১টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৮৬, আহত ৭৪৬ জন। ২০১৭ সালে ২০৫টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৭৪, আহত ৮৪৮ জন। ২০১৮ সালে ২৭৭টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩৩৯, আহত ১ হাজার ২৬৫ জন। ২০১৯ সালে ২৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৭৩, আহত ৮৪৯ জন। ২০২০ সালে ১৪৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৬৮, আহত ২৮৩ জন। ২০২১ সালে ৩১৮টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩২৩, আহত ৬২২ জন। ২০২২ সালে ৩৭২টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪১৬, আহত ৮৪৪ জন। ২০২৩ সালে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩২৮, আহত ৫৬৫ জন। ২০২৪ সালে ৩৯৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪০৭, আহত ১ হাজার ৩৯৮ জন। ২০২৫ সালে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩২২, আহত ৮২৬ জন।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক, নৌ ও রেলপথের সমস্যাগুলো চিহ্নিত এবং সমাধানের পথও জানা, কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দায়িত্বপ্রাপ্তরা আন্তরিক হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কঠোর নির্দেশনা থাকায় দুর্ঘটনা কিছুটা কম ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে, যার ফলে অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা বেড়েছে।

Link copied!