সোমবার, ০৯ মার্চ, ২০২৬

নির্যাতিত হয়ে ৭ বছরে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী, ৮০০ জন ফিরেছেন লাশ হয়ে

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : মার্চ ৮, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

নির্যাতিত হয়ে ৭ বছরে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী, ৮০০ জন ফিরেছেন লাশ হয়ে

ভাগ্য বদলের আশায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে সৌদি আরবে যান কুড়িগ্রামের এক নারী। সেখানে গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে জীবন বাঁচাতে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন। দুই মাস পর তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে আসা রংপুরের এক নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর অভাবের কারণে তিনি সৌদি আরবে যান। যে বাড়িতে তিনি কাজ করতেন, সেখানে শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, বাইরে থেকে আসা পুরুষরাও তাকে নির্যাতন করতেন। প্রতিবাদ করায় তাঁর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। যশোরের আরেক নারী জানান, গৃহকর্তা, তাঁর ছেলে এবং ছেলের বন্ধুরাও তাঁকে যৌন নির্যাতন করেছেন।

সংসারে সচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশি নারী অভিবাসীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে দেশে ফেরার ঘটনাও কমেনি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরেছেন, তার সঠিক তথ্য নেই। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। তাদের বেশির ভাগই নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া অন্তত ৮০০ নারীর লাশ দেশে এসেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি নারী পাচারের শিকার হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‍‍`অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক‍‍`।

বিএমইটির তথ্য বলছে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করলেও এটি ধারাবাহিক রূপ পায় ২০০৪ সালের দিকে। ২০১৩ সালে প্রথমবার বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশে যান। ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তির পর এই সংখ্যা বছরে এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। করোনা মহামারির দুই বছর বাদ দিলে ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন।

সাত বছরে ফিরেছেন ৭০ হাজার
বিদেশ থেকে কত বাংলাদেশি নারী দেশে ফিরেছেন, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছে ব্র্যাক। এর মধ্যে করোনাকালে ২০২০ সালে ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, বন্দি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে এক হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ছয় হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে দুই হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে তিন হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন।

নিপীড়নের অভিযোগ অধিকাংশের
দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশের অভিযোগ, বিদেশে তারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করানোর মতো সমস্যার মুখে পড়েন। ব্র্যাক জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীদের মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা অন্তত ১২১ নারীকে তারা সেবা দিয়েছে। এ ছাড়া নিপীড়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন আরও হাজারো নারী।

মৌলভীবাজারের বড়লেখার রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। সেখানে তাকে দীর্ঘ সময় কাজ করানো, কম খাবার দেওয়া এবং নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ বছর তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ভেবেছিল তিনি মারা গেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ও পিবিআইয়ের সহযোগিতায় তাঁর পরিচয় শনাক্তের পর তাঁকে পরিবারের কাছে ফেরানো সম্ভব হয়।

ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকেই পালিয়ে দূতাবাসের সেফ হাউসে আশ্রয় নেন। সৌদি দূতাবাসের বিভিন্ন চিঠিতেও এই পরিস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক এক রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, ‍‍`এ পর্যন্ত ৫৫ গৃহকর্মী অতিরিক্ত কাজের চাপ, দুর্ব্যবহার বা নির্যাতনের কারণে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রতিদিনই তিন-চারজন গৃহকর্মী এভাবে আশ্রয় নিচ্ছেন।‍‍` আরেক চিঠিতে নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট সৌদি আরব ফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফেরা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করে।

নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারীদের অভিজ্ঞতা থেকে মোটামুটি তিন ধরনের সমস্যা দেখা যায়। প্রথমটি কাজ ও বেতনসংক্রান্ত। অনেক নারী অভিযোগ করেন, তারা ওই দেশের খাবার, পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না এবং নিয়মিত বেতনও পান না। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বাসায় কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, কাজ বা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলে নিয়োগকর্তারা তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। তৃতীয়ত, যৌন নির্যাতনের ঘটনা। তিনি বলেন, এসব নির্যাতন অনেক সময় এতটাই ভয়াবহ যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র থাকে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Link copied!