শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে চীনে গেলেও বড় কোনো চুক্তি করতে পারেননি ট্রাম্প

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : মে ১৫, ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে চীনে গেলেও বড় কোনো চুক্তি করতে পারেননি ট্রাম্প

বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার চূড়ান্ত দফার বৈঠক শেষ হয়েছে। ট্রাম্প এই বৈঠককে ‍‍`সম্ভবত সর্বকালের সেরা সম্মেলন‍‍` এবং ‍‍`অসাধারণ বাণিজ্য চুক্তির‍‍` সূচনা বলে দাবি করলেও, বাস্তবে বড় কোনো অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়নি। বহুল আলোচিত এই সম্মেলনে কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়ে ইতিবাচক বক্তব্য ও আনুষ্ঠানিকতাতেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবারের দুই ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো ব্যাপক চুক্তির ঘোষণা আসেনি।

বোয়িং চুক্তি এবং বাণিজ্য সম্পর্ক
এই সম্মেলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফলাফল হলো ট্রাম্পের একটি ঘোষণা, যেখানে তিনি জানান—চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। প্রায় এক দশক পর চীন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাণিজ্যিক বিমান কিনছে। তবে বাজারের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ শীতল। বিশ্লেষকরা আরও বড় অর্ডারের প্রত্যাশা করেছিলেন, যার ফলে এই ঘোষণার পর বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।

বড় কোনো কাঠামোগত বাণিজ্য চুক্তি অধরা থাকলেও, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে—নতুন করে শুল্ক আলোচনায় না গিয়ে সম্পর্ক পরিচালনার জন্য দুই নেতা একটি ‍‍`বোর্ড অব ট্রেড‍‍` গঠনে সম্মত হয়েছেন।

গত অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে যে ‍‍`বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি‍‍` (ট্রেড ট্রুস) হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শুক্রবার জানিয়েছেন, নভেম্বরের পর এই যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ভবিষ্যতে বিনিয়োগের জন্য একটি নতুন ‍‍`মেকানিজম‍‍` তৈরির অগ্রগতির কথা জানালেও মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন—এগুলো পুরোপুরি চালু হতে এখনো অনেক কাজ বাকি।

প্রযুক্তি এবং এআইয়ের প্রাধান্য
টেসলার সিইও ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে—বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সেমিকন্ডাক্টর এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এখনো একটি বড় উত্তেজনার কারণ হলেও, এআই নিয়ে আলোচনা এই সম্মেলনে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট জোর দিয়ে বলেন যে, এআই খাতে চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখাটা ‍‍`অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ‍‍`। তীব্র প্রতিযোগিতার এই আবহের মধ্যেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন তার সফরসঙ্গী নির্বাহীদের কোম্পানিতে "শত শত বিলিয়ন ডলার" বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে; তবে তিনি এর বিস্তারিত কিছু জানাননি।

তাইওয়ান ইস্যুতে ‍‍`রেড লাইন‍‍` বা কড়া বার্তা
একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনে দেখা গেছে, বেইজিং এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সরাসরি তাইওয়ান ইস্যুর সাথে যুক্ত করছে। আলোচনার সময় প্রেসিডেন্ট শি কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে, তাইওয়ান ইস্যুটি দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়।

শি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি ঠিকমতো সামলাতে না পারলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বা "এমনকি যুদ্ধও" হতে পারে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বেইজিং তাইওয়ানকে শুধু ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং যেকোনো ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে।

মধ্যপ্রাচ্য এবং ইরান
বৈশ্বিক নিরাপত্তাও এই সম্মেলনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল। তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং ইরানের চলমান সংঘাত প্রশমনে ট্রাম্প চীনের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প জানান, শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে চান এবং সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন।

শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যে "সর্বাত্মক এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির" আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো দ্রুত খুলে দেওয়ারও তাগিদ দিয়েছে চীন।

ভবিষ্যতের রূপরেখা
বড় কোনো চুক্তি না হলেও কূটনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত রয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আশা করা হচ্ছে, আগামী শরতের এই সম্মেলনের আগেই দুই দেশের প্রশাসন সম্ভাব্য কোনো বড় চুক্তির রূপরেখা তৈরিতে কাজ করবে, যা এবার সম্ভব হয়নি।

Link copied!