প্রকাশিত: : এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম
যুক্তরাজ্যে ভুয়া সমকামী পরিচয়ে আশ্রয় আবেদন সাজিয়ে দেওয়ার অভিযোগে কিছু আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রতারণার তথ্য উঠে এসেছে। বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে ভুয়া প্রমাণপত্র তৈরি করে আশ্রয় প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে।
যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি বা ভিসা পাওয়ার জন্য অভিবাসীদের ভুয়া সমকামী সাজার পরামর্শ দিচ্ছে এক শ্রেণির `ল ফার্ম` বা আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। বিনিময়ে অভিবাসীদের কাছ থেকে তারা কয়েক হাজার করে পাউন্ড হাতিয়ে নিচ্ছে। বিবিসির অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিবাসীর বড় একটি অংশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাগরিক। যুক্তরাজ্যে তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। সেই আবেদনে দাবি করা হয়েছে, তারা সমকামী। নিজ দেশে ফিরে গেলে বিপন্ন হতে পারে জীবন।
নিজের দেশে ফিরে গেলে যারা বিপদে পড়তে পারে, তাদের বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের আশ্রয় প্রক্রিয়া অনেকটাই সুরক্ষা দেয়। কিন্তু অনুসন্ধানে বিবিসি দেখেছে, অভিবাসীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ফি নেওয়া ল ফার্মগুলো এই সুরক্ষা প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে। জালিয়াতির শিকার অভিবাসীরা পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণ ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে।
গত বছর যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ায়। তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই এই তিন ধরনের ভিসায় প্রবেশ করেছিলেন। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদের ভুয়া জীবনবৃত্তান্ত বা কভার স্টোরি কীভাবে তৈরি করে দেওয়া হয়, তা এক দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে তুলে ধরেছে বিবিসি। এতে দেখা গেছে, আইনি পরামর্শকরাই অভিবাসীদের ভুয়া প্রমাণপত্র, সমর্থনসূচক চিঠি, ছবি ও মেডিকেল রিপোর্ট তৈরির পদ্ধতি শিখিয়ে দেন।
সব তথ্যই ভুয়া!
প্রাথমিক তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিবিসির আন্ডারকভার সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামেন। তারা কয়েকটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে নিজেদের পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেন। তারা জানান, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পরের ধাপগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো হলো– একটি ল ফার্ম ভুয়া আশ্রয় আবেদন সাজাতে সাত হাজার পাউন্ড (১০ লাখ টাকার বেশি) পর্যন্ত দাবি করেছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বারা এই আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম; ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা সাধারণ চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে নিজেকে হতাশাগ্রস্ত হিসেবে তুলে ধরেন। এর উদ্দেশ্য চিকিৎসা সনদ পাওয়া। এ ধরনের সনদ তাদের আশ্রয়ের আবেদনকে শক্তিশালী করে। এমনকি একজন আবেদনকারীকে `এইচআইভি পজিটিভ` হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিতেও দেখা গেছে।
বিবিসির ছদ্মবেশী আবেদনকারীর বিশ্বস্ততা অর্জন করতে এক পরামর্শক দাবি করেন, তিনি ১৭ বছর ধরে এ কাজ (ভুয়া আবেদন তৈরি) করছেন। আবেদনকারী যে সমকামী তা প্রমাণ করতে একজন সাক্ষী জোগাড় করে দেওয়ারও আশ্বাস দেন। এ ধরনের সাক্ষীরা মূলত, আবেদনকারীর সঙ্গে তাদের যৌন সম্পর্ক থাকার ভুয়া দাবি করেন।
বাংলাদেশি আবেদনকারী কত?
ঠিক কত আশ্রয়প্রার্থী এভাবে ভুয়া আবেদন করছেন, সেটির সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা কঠিন। তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেক্সচুয়াল ওরিয়েন্টেশন বা যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার দৌড়ে পাকিস্তানি নাগরিকরা অনেক এগিয়ে। এর পরে আছেন বাংলাদেশিরা।
২০২৩ সালের সবশেষ তথ্যে দেখা গেছে, তিন হাজার ৪৩০টি এলজিবিটি আশ্রয় আবেদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে নতুন আবেদনের সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার ৪০০। আবেদনকারীদের ৪২ শতাংশই পাকিস্তানের নাগরিক। গত পাঁচ বছর ধরে তালিকায় শীর্ষে আছে দেশটি।
একই বছর বিভিন্ন কারণে যুক্তরাজ্যে মোট রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান চতুর্থ (মাত্র ৬ শতাংশ)। কিন্তু যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে আবেদনের ক্ষেত্রে তালিকায় দেশটি শীর্ষে– ৫৭৮ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের নাগরিক ১৭৫ জন। এর পরে আছে যথাক্রমে নাইজেরিয়া (১০৩), ভারত (৩৯), উগান্ডা (৩৫) এবং অন্যান্য দেশের ৪৪৭ জন।
যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনের সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে করা রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই প্রাথমিক পর্যায়ে অনুমোদন পায়।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যারা আশ্রয় পাওয়ার মতো সুরক্ষা ব্যবস্থার অপব্যবহার করবে, তাদের কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হবে।