প্রকাশিত: : মার্চ ১১, ২০২৬, ০৮:২২ পিএম
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার নেতিবাচক প্রভাব সামনে আসায় সুইডেন আবারও কাগজের বইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরছে। পড়ার দক্ষতা ও মনোযোগ বাড়াতে পাঠ্যবই, লাইব্রেরি উন্নয়ন এবং ছোটদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে সরকার।
সুইডেনের স্কুলগুলো আবার ধীরে ধীরে কাগজের বইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। একসময় শ্রেণিকক্ষে ট্যাবলেট ও ল্যাপটপ ব্যবহারের জন্য দেশটি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে তাদের পড়ার দক্ষতা ও মনোযোগ দুটিই কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছে না। এসব কারণেই সুইডিশ সরকার আবারও বইভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে।
গত এক দশকে সুইডেন ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তারে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়। অনেক দেশের মতো সেখানে স্কুলগুলোতে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শ্রেণিকক্ষকে আধুনিক করা এবং শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। ধারণা করা হয়েছিল, এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য তারা সহজেই হাতের কাছে পাবে।
২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সুইডেনের অনেক স্কুলে পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপ ও আইপ্যাড তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এর ফলাফল প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। একসময় ইউরোপে শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতায় শীর্ষ অবস্থানে থাকা সুইডেন ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের গভীর মনোযোগ ও পাঠ দক্ষতা কমে যাচ্ছে। হাতে লেখার বদলে কিবোর্ডে টাইপ করার অভ্যাস তাদের মনে রাখার ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি পড়াশোনার বদলে গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করায় শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলাফলেও।
২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন পরীক্ষা পিসা (PISA)-তে ১৫ বছর বয়সী সুইডিশ শিক্ষার্থীদের পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানে দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এ পরিস্থিতির পর দেশজুড়ে নতুন করে বইভিত্তিক শিক্ষার দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবারও পাঠ্যবই শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে এর ইতিবাচক ফলও দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও শেখার মান ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য দেশজুড়ে বই পড়ার প্রতিযোগিতাও চালু করা হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি বই পড়া শ্রেণিকে পুরস্কৃত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশু প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে বড় হচ্ছে। এর ফলে অনেকেই উচ্চশিক্ষায় পৌঁছেও ঠিকভাবে পড়তে বা লিখতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ভুলভাবে ডিসলেক্সিয়া বা পড়ার সমস্যায় আক্রান্ত বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা হলো ছোটবেলায় তাদের বই পড়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা দেওয়া হয়নি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কাগজের বইয়ের বদলে স্ক্রিননির্ভরতার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা কমে যাওয়াকেও দায়ী করা হচ্ছে। অভিবাসন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জগুলোও সময়মতো মোকাবিলা করা যায়নি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুইডেন সরকার পাঠ্যবই ও শিক্ষকদের সহায়তার জন্য গত বছর প্রায় ৬২ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য গল্প ও তথ্যভিত্তিক বই কিনতে আরও ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্কুলের লাইব্রেরিগুলোও উন্নত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ছোট শিশুদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বড় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিতভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হবে।
শিক্ষকেরা এখন আবারও পুরোনো পদ্ধতিতে উচ্চস্বরে পাঠ পড়ানোর চর্চা শুরু করেছেন। এতে শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা দ্রুত উন্নত হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। ফলে তারা শুধু ভাষা নয়, গণিত, বিজ্ঞান ও ভূগোলের মতো বিষয়ও ভালোভাবে বুঝতে পারছে।
দক্ষিণ সুইডেনের লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন্ডা ফালথ জানিয়েছেন, ২০২৮ সাল থেকে দেশজুড়ে একটি নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তারা শিশুদের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে পড়তে শেখাতে পারেন।