মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬

বিশ্বের প্রথম র‍্যাপার প্রধানমন্ত্রী হবেন বালেন্দ্র শাহ

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : মার্চ ৮, ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম

জেন–জি আন্দোলনের পর নেপালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত মিলেছে। সাবেক র‍্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে আরএসপি বিপুল সমর্থন পেয়ে পুরনো দলগুলোকে পেছনে ফেলছে, আর তরুণ ভোটারদের ঢেউয়ে তিনি দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন।

বিশ্বের প্রথম র‍্যাপার প্রধানমন্ত্রী হবেন বালেন্দ্র শাহ

সাবেক র‍্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র এবং রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) প্রার্থী বালেন্দ্র শাহ ঝাপা-৫ আসনে পরাজিত করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে। ভোটের ব্যবধান প্রায় অর্ধলাখ।

চূড়ান্ত ভোট গণনায় বালেন শাহ পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩৪৮ ভোট। আর ওলির পক্ষে পড়েছে মাত্র ১৮ হাজার ৭৩৪ ভোট। গত বছর জেন-জি প্রজন্মের গণ-আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত এই প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দেশটির রাজনৈতিক ও ক্ষমতার কাঠামো আমূল বদলে যাচ্ছে—এমন লক্ষণ এই একটি আসনেই স্পষ্ট হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তরুণ ভোটার ও জেন-জির সমর্থন আরএসপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিতে যাচ্ছে।

এতদিনের প্রতিষ্ঠিত ও ক্ষমতায় থাকা দলগুলো পাত্তাই পাচ্ছে না ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত দল আরএসপির কাছে। গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে নিশ্চিত হয়ে গেছে যে সরকার গঠনের জন্য আরএসপিকে বেছে নিচ্ছে নেপালের আপামর জনতা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেন-জিদের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পথে রয়েছে সাবেক র‍্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহর দল। সবার কাছে ‘বালেন’ নামে পরিচিত এ তরুণ নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপালের নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ফলাফল থেকে এটা স্পষ্ট, পুরনো প্রতিষ্ঠিত দল ও রাজনীতিকদের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দেশটির সাধারণ ভোটাররা। আর এর মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরএসপি। মধ্যপন্থী দল হিসেবে পরিচিত আরএসপি নির্বাচনী প্রচারণায় ডিজিটাল আধুনিকায়ন এবং সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছিল।

গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত নেপালের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি সভার ১৬৫টি সরাসরি আসনের মধ্যে আরএসপি এরই মধ্যে ৪৪টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে। এছাড়া আরো ৭৫টি আসনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। নেপালের ইতিহাসে ২৭ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।

নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে এবং ইউএমএল তৃতীয় স্থানে রয়েছে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হতে আরো অন্তত দুইদিন সময় লাগবে। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনার কার্যক্রম পদ্ধতিগতভাবে ধীরগতির। এছাড়া দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়।

নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থা অনুযায়ী, ফেডারেল আইনসভার ৬০ শতাংশ প্রতিনিধি ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ বা সরাসরি ভোট পদ্ধতির মাধ্যমে এবং বাকি ৪০ শতাংশ সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচিত হন। সরাসরি নির্বাচনী ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিনিধি সভার ১৬৫টি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আর সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচিত হন ১১০ জন।

নেপালের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ সিডি ভট্টের মতে, ৩৫ বছর ধরে মূলধারার দলগুলো রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিজেদের কবজায় রেখেছিল এবং একই মুখ বারবার ক্ষমতায় আসছিল। তাই এবারের নির্বাচনে লড়াই ছিল পরিবর্তনের পক্ষের শক্তি এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাওয়া শক্তির মধ্যে। নেপালি রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একসময়ের মূলধারার দলগুলো প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, আর প্রান্তিক শক্তিগুলোই মূলধারায় পরিণত হয়েছে।

এ নির্বাচনে বিপর্যয় নেমে এসেছে নেপালি কংগ্রেসের ওপর। গত সংসদের বৃহত্তম দল কংগ্রেস এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতা গগন থাপাও নিজ আসনে পরাজয়ের মুখে রয়েছেন। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহল প্রচন্ড রুকুম পূর্ব-১ আসন থেকে জয়ী হলেও তার দল নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে মাত্র দুটিতে জয় পেয়েছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নেপালের এ পরিবর্তনের পেছনে তরুণ ভোটারদের সরাসরি প্রভাব দেখছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে জেন-জি প্রভাবিত আন্দোলনে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের প্রতিফলন ঘটেছে আরএসপির নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘণ্টা’ মার্কায়। প্রথমবারের মতো ভোটার হওয়া প্রায় আট লাখ তরুণ এবং জেন-জি ভোটারদের বেশির ভাগ ৩৫ বছর বয়সী বালেন শাহর পক্ষে রায় দিয়েছেন। গত বছর আন্দোলনের সময় বালেন প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

নতুন দল হয়েও আরএসপির এ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশটির রাজনৈতিক পণ্ডিত ও পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে। কারণ নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো একটি দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অসম্ভব বলে আগে মনে করা হতো। গত দুই দশক ধরে নেপালে বিভিন্ন জোট সরকার শাসন পরিচালনা করেছে।

নির্বাচনে সারা দেশে আরএসপির ব্যাপক সমর্থন দেখে অর্থমন্ত্রী রামেশ্বর খানাল ফেসবুকে লিখেছেন, এখন পর্যন্ত গণনা করা ভোটের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, এ সংবিধানের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব নয়—এ দাবি আবারো ভুল প্রমাণ হতে যাচ্ছে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কাঠমান্ডুর দুর্নীতিমুক্ত মেয়র হিসেবে বালেন শাহর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি আরো কিছু কারণে মানুষ আরএসপির ওপর এমন আস্থা রেখেছে।

আরএসপির মুখপাত্র মনিশ ঝা এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং এর জন্য আমাদের আরো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের নেতা হিসেবে নয়, বরং সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতে হবে। জনগণ বড় প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের ওপর ম্যান্ডেট ও দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আমাদের আসল শত্রু হলো দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং কুশাসন।’

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক লোকরাজ বারাল এ ফলাফলকে ‘নজিরবিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, পুরনো দল এবং তিন দলের সিন্ডিকেটের ওপর মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা থেকেই এ গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে মৌলিক সেবা পৌঁছে দিতে আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতা এবং বালেন শাহর জনপ্রিয়তা আরএসপির পক্ষে এ জোয়ার তৈরি করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারে থাকাকালে পারফরম্যান্স দেখাতে না পারলে এমন জোয়ার সাময়িক হতে পারে।

বালেন্দ্র শাহ নেপালে র‍্যাপার"‘বালেন’ নামে জনপ্রিয়। সামাজিক সমস্যা এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির সমালোচনা করে তার তৈরি সংগীত তরুণদের প্রভাবিত করে। ২০২২ সালে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র হন। কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা বালেন্দ্রকে নির্বাচনের রাজনীতিতে সাহায্য করেছে। তিনি মেয়র থাকাকালে ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, সরকারি জমির ওপর দখল অপসারণ এবং দীর্ঘদিনের আবর্জনা অপসারণ সমস্যা সমাধানে কাজ করেন। এভাবে তিনি র‍্যাপার থেকে জরুরি রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন।

সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় ৩৫ বছর বয়সী বালেনের সমাবেশে বিপুল জনসমাগম ঘটে। তিনি যে নেপালের তরুণ ভোটারদের অঘোষিত নেতা হয়ে উঠেছেন সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন।

ফেব্রুয়ারিতে আরএসপির প্রকাশিত ইশতাহারে ১২ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির ওয়াদা করে। ক্ষমতায় গেলে পাঁচ বছরে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৪৭ ডলার থেকে ৩ হাজার ডলারে উন্নীত করার কথাও বলা হয়েছে। আরো ছিল স্বাস্থ্যসেবায় বীমা চালুর কথা।

Link copied!