প্রকাশিত: : মার্চ ৭, ২০২৬, ১২:২০ পিএম
টানা ২৪ ঘণ্টার ব্ল্যাকআউটে (বিদ্যুৎহীন অবস্থা) বিপর্যস্ত কিউবা। দেশটির এই সংকটের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। কিউবার শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসা এখন `কেবল সময়ের ব্যাপার` বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার ইন্টার মায়ামি ফুটবল দলের তারকা লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ এবং অন্যান্য ফুটবলারদের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে কিউবা নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প। সেখানে মায়ামি ক্লাবের মালিক এবং কিউবান বংশোদ্ভূত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হোরহে মাস-কে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প বলেন, তারা শীঘ্রই `কিউবায় যা ঘটছে তা উদযাপন করতে যাচ্ছে`। তিনি আরও দাবি করেন, কিউবার কর্তৃপক্ষ একটি সমঝোতায় আসতে চায় এবং তারা এর জন্য `ভীষণ মরিয়া`।
ট্রাম্পের কথার প্রতিক্রিয়ায় হোর্হে মাস বলেন, `এটি একটি অসাধারণ দিন হতে যাচ্ছে।`
পরদিন শুক্রবার সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর সাথে আলাপকালেও ট্রাম্প বলেন, `খুব শিগগিরই কিউবার পতন ঘটবে।` তিনি আরও জানান, দ্বীপরাষ্ট্রটির নেতৃত্ব একটি চুক্তির জন্য আলোচনা করছে এবং তিনি এই প্রক্রিয়ায় মার্কো রুবিওকে দায়িত্ব দেবেন।
ট্রাম্পের মতে, বর্তমান মনোযোগ ইরানের দিকে থাকলেও কিউবার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় আছে। তিনি বলেন, `৫০ বছর পর কিউবা এখন প্রস্তুত।`
ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট যে, তার প্রশাসন এই অঞ্চলে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিউবার ওপর ক্রমাগত চাপ বজায় রাখতে চায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে (মার্কো রুবিও) `সেখানে পাঠানো`র বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে সরাসরি আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বছরের শুরুতে গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো অভাবনীয় ঘটনার পর কিউবায় এমন পরিবর্তন এখন আর অসম্ভব মনে করা হচ্ছে না।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের পর কিউবা তার অপরিশোধিত তেলের প্রধান উৎস হারিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে কিউবার অন্যান্য জ্বালানি অংশীদাররা, বিশেষ করে মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলার সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারছে না।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন পুরো কিউবা জুড়ে স্পষ্ট। ময়লাবাহী ট্রাকগুলো বন্ধ পড়ে থাকায় রাস্তায় আবর্জনার পাহাড় জমেছে। জনস্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা রাতে আবর্জনার স্তূপে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে বাতাস কটু ধোঁয়ায় ভরে উঠছে। এমনকি রাজধানী হাভানার অভিজাত এলাকাগুলোতেও মানুষ এখন রান্নার জন্য কাঠের লাকড়ি ব্যবহার করছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু গাড়ি নয়, জেনারেটর চালানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিউবার জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তেলের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। সোলার প্যানেল বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এবং রুবিও বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কিউবার ওপর এই চাপ কমানোর এখনই উপযুক্ত সময় নয়। এটি কিউবাকে আলোচনার টেবিলে দুর্বল অবস্থানে ফেলার একটি কৌশল হতে পারে।
সমালোচকদের মতে, এই নীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে সাধারণ কিউবানদের ওপর—দেশটির নেতৃত্বের ওপর নয়। তাদের প্রশ্ন, দ্বীপদেশটিতে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থান উসকে দিতেই কি এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে কিউবার শীর্ষ নেতৃত্বের গোপন আলোচনার গুঞ্জন থাকলেও কিউবান সরকার তা নিশ্চিত করেনি। শোনা যাচ্ছে, বিপ্লবী নেতা রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গুইলারমো রদ্রিগেজ কাস্ত্রো হাভানার পক্ষ থেকে যোগাযোগের প্রধান সূত্র হিসেবে কাজ করছেন।
চরম সংকটের মুখে কিউবা সরকার বেসরকারি খাতকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ এতে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছে না, কারণ এই আমদানি দেশটির মোট চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।
এদিকে, পর্যটন খাতেও ধস নেমেছে। তেলের অভাবে বিমানগুলো হাভানা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। এয়ার ফ্রান্সের মতো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো কিউবায় তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। বর্তমান আবহাওয়া কিছুটা শীতল থাকায় বিদ্যুৎ ছাড়া মানুষ কোনোমতে রাত কাটাতে পারছে না। তবে সামনের প্রখর গ্রীষ্মে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা ফ্যান ছাড়া জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন দেশটির নাগরিকরা।