শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

পাকিস্তানের ‘থান্ডার’ ফাইটার জেট কিনতে ‍‍`লাইন দিচ্ছে‍‍` বিভিন্ন দেশ

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সাফল্যের কারণে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের আন্তর্জাতিক চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, সৌদি আরবসহ একাধিক দেশের সঙ্গে বড় চুক্তির পথে এগোচ্ছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানের ‘থান্ডার’ ফাইটার জেট কিনতে ‍‍`লাইন দিচ্ছে‍‍` বিভিন্ন দেশ

গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, রিয়াদ আসলে ইসলামাবাদের কাছে কী চাইছে। মূলত পাকিস্তানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের দিকেই নজর ছিল তাদের।

শুধু সৌদি আরব নয়, এই যুদ্ধবিমান পেতে আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া এবং লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মিও। ইতিমধ্যে কোনো কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে, আবার কোনোটি চূড়ান্ত হওয়ার পথে।

দামে কম কিন্তু কার্যকারিতায় দুর্দান্ত—এ কারণেই জেএফ-১৭ বিমানের চাহিদা বাড়ছে। গত মে মাসে দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ—পাকিস্তান ও ভারত যখন সংঘাতে জড়িয়েছিল, তখন এই বিমানের পরীক্ষা হয়ে গেছে। ভারতের হাতে থাকা ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে জেএফ-১৭ দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। আর এরপরই অন্য দেশগুলো এটি কিনতে লাইনে দাঁড়ায়।

কোথায় তৈরি, কী আছে এতে

হালকা ও বহুমুখী হামলায় সক্ষম এই যুদ্ধবিমান তৈরি হয় পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে (পিএসি)। রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মাত্র ৫০ মাইল দূরেই এর কারখানা।

বর্তমানে এর ‍‍`ব্লক-টু‍‍` সংস্করণটি বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এটি ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক রাডার এবং দৃষ্টিসীমার বাইরেও আঘাত হানার মতো ক্ষেপণাস্ত্র। আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে—উভয় ধরনের হামলায় এটি পারদর্শী। এই বিমানে চীনের তৈরি পিএল-১০ই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত শক্তিশালী।

যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ বা রাশিয়ার এসইউ-২৭ যুদ্ধবিমান মূলত আকাশযুদ্ধের জন্য তৈরি। কিন্তু পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডারে রয়েছে আরও উন্নত এভিওনিক্স, অত্যাধুনিক ‍‍`অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে‍‍` (এইএসএ) রাডার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। ফলে প্রযুক্তির বিচারে এটি আগের মডেলগুলোর চেয়ে এগিয়ে।

পাকিস্তান বিমানবাহিনী বলছে, মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় ওড়ার সময় এই বিমান অত্যন্ত ক্ষিপ্র। এর ধ্বংসক্ষমতা ও টিকে থাকার সক্ষমতাও অনেক বেশি। সব মিলিয়ে যেকোনো বিমান বাহিনীর জন্য এটি একটি শক্তিশালী সংযোজন হতে পারে।

এতে থাকা এইএসএ রাডারের সাহায্যে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা যায়। অনেক দূর থেকেও এটি স্পষ্ট সংকেত দিতে পারে। তবে এতে ‍‍`স্টেলথ‍‍` প্রযুক্তি বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এ দিক থেকে এটি সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন এবং চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমানের সমকক্ষ।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর দাম। এসব যুদ্ধবিমানের তুলনায় জেএফ-১৭ অনেক সস্তা। এর আনুমানিক দাম আড়াই কোটি থেকে তিন কোটি ডলারের মধ্যে।

যুদ্ধের ময়দানে সাফল্য

অন্যান্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনা করলে জেএফ-১৭-এর দামের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধবিমানের একেকটির দাম পড়ে ৯ কোটি ডলারেরও বেশি। সুইডেনের গ্রিপেন কিনতে লাগে ১০ কোটি ডলারের বেশি।

ইউরোফাইটার টাইফুনের দাম প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। চীনের জে-১০ বিমানের দামও ৫ কোটি ডলারের মতো। আর যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ লাইটনিং-টু বিমানের একেকটির দাম পড়ে প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

দামের পাশাপাশি জেএফ-১৭-এর আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এর পরীক্ষিত সাফল্য। ২০১৯ ও ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে আকাশযুদ্ধে এই বিমান নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। আটক করা হয় ভারতীয় পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন অভিনন্দন বর্তমানকে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যস্থতায় দুই দিন পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ওই সংক্ষিপ্ত সংঘাতে ভারতের পাঁচ বিমানবাহিনী কর্মকর্তা ও ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

অন্যদিকে গত বছরের মে মাসে চার দিনের এক সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের ছয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের তৈরি তিনটি রাফাল যুদ্ধবিমানও ছিল। ভারত তাদের ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করলেও ঠিক কতটি বিমান হারিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

পাকিস্তান বিমানবাহিনী দাবি করেছে, ভারতীয় যুদ্ধবিমানের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের জেএফ-১৭ অংশ নিয়েছিল। এমনকি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতের এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানা হয়েছে। ভারত অবশ্য তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো ক্ষতির কথা অস্বীকার করেছে।

গত ১০ মে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‍‍`অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি‍‍`র ঘোষণা দিলে হুট করেই লড়াই থেমে যায়। সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানোর কৃতিত্ব দিয়ে পাকিস্তান পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার বলেছেন, ওই লড়াইয়ে ছয় থেকে আটটি বিমান ভূপাতিত হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে তিনি মূলত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পারফরম্যান্সকেই ইঙ্গিত করেছেন।

বেড়েই চলেছে চাহিদা

অবশ্য এই বিমানের সক্ষমতা ও কম দামের বিষয়টি ছোট সামরিক শক্তিগুলোর নজরে এসেছিল আরও আগেই। ২০১৫ সালে প্রথম দেশ হিসেবে জেএফ-১৭ কেনে মিয়ানমার। ১৫টির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭টি বিমান তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণেই বাকিগুলো সরবরাহে দেরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

২০২১ সালে নাইজেরিয়া তিনটি জেএফ-১৭ কেনে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আজারবাইজান ১৬টি বিমান কিনতে ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করে। নভেম্বরে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে তারা পাঁচটি জেএফ-১৭ প্রদর্শনও করেছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, গত মে মাসের সংঘাতের পর জেএফ-১৭-এর কদর অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা এটির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

ছয় দেশের সঙ্গে চুক্তির পথে

গত ৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে দেখা করেন বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাহমুদ খান।

ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার ‍‍`সম্ভাবনা‍‍` নিয়ে আলোচনা হয় হাসান মাহমুদ খাঁন। বৈঠকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসং।

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলছে, বাংলাদেশের কাছে জেএফ-যোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলছে, বাংলাদেশের কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

গত সোমবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেএফ-১৭ বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তি নিয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসলামাবাদে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানেও জেএফ-১৭ বিক্রি নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

এদিকে, একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, জাকার্তা ৪০টিরও বেশি বিমান কিনতে পারে। এ ছাড়া ইরাকও, জাকার্তা ৪০টিরও বেশি বিমান কিনতে পারে। এ ছাড়া ইরাকও এই যুদ্ধবিমান কিনতে ‍‍`গভীর আগ্রহ এই বিমান কিনতে ‍‍`প্রবল আগ্রহ‍‍` দেখিয়েছে।

এর আগে লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গেও পাকিস্তানের বড় ধরনের চুক্তি হয়েছে। গত মাসেই ৪০০ কোটি ডলার কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে। ওই চুক্তির আওতায় এক ডজনেরও বেশি যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে তারা। এসব ঘটনাের বিনিময়ে তাদের কাছে এক ডজনেরও বেশি যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি সই করেছে পাকিস্তান।

সৌদি ঋণের বদলে যুদ্ধবিমান?

পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা চলছে, যাতে সৌদি আরবের দেওয়া প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণ জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তিতে রূপান্তর করা যায়।

পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল ও বিশ্লেষক আমির মাসুদ জানিয়েছেন, পাকিস্তান ছয়টি দেশের সঙ্গে জেএফ-১৭, ইলেকট্রনিক সিস্টেম ও অস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবও এই দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে আলোচনার বিস্তারিত তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।

বর্তমানে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৭০০ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এটি আইএমএফের সঙ্গে তাদের ২৪তম কর্মসূচি। এর আগে ২০২৩ সালে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচতে ৩০০ কোটি ডলারের একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করেছিল দেশটি। সে সময় সৌদি আরব ও উপসাগরীয় মিত্ররা ঋণ ও আমানতের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার পরই আইএমএফের সহায়তা নিশ্চিত হয়েছিল।

স্টিমসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া প্রোগ্রামের নন-রেসিডেন্ট ফেলো এবং আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারি বলেন, ‍‍`জেএফ-১৭ রপ্তানির ক্ষেত্রে সত্যিকারের সাফল্য পেয়েছে। পাকিস্তান যদি একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা রপ্তানি শিল্প গড়ে তুলতে পারে, তবে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মর্যাদা বাড়াবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও সহায়ক হবে। এতে নিজেদের তৈরি বা যৌথভাবে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন খরচও কমে আসবে।‍‍`

গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, অস্ত্রশিল্পের এই সাফল্য দেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। জিও নিউজকে তিনি বলেন, ‍‍`আমাদের যুদ্ধবিমান পরীক্ষিত এবং আমরা এত অর্ডার পাচ্ছি যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের হয়তো আর আইএমএফের সাহায্যের দরকার হবে না।‍‍`

Link copied!