শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬

আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই, নিজের নৈতিকতাই যথেষ্ট: মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ট্রাম্প

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

আমার আন্তর্জাতিক আইনের দরকার নেই, নিজের নৈতিকতাই যথেষ্ট: মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ট্রাম্প

বিশ্বজুড়ে নিজের নেওয়া আগ্রাসী নীতি নিয়ে এবার  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই; বরং নিজের ‍‍`নৈতিকতাই‍‍` তার জন্য যথেষ্ট।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ট্রাম্পের এমন কঠোর ও বিতর্কিত অবস্থান সামনে এল।

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‍‍`দ্য নিউইয়র্ক টাইমস‍‍`-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "আমার আন্তর্জাতিক আইনের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি মানুষকে কষ্ট দিতে চাই না।"

আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি আইন মানেন। তবে তাঁর মতে, "এটি নির্ভর করে আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা আপনি কীভাবে দিচ্ছেন, তার ওপর।"

পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‍‍`গায়ের জোর‍‍`  ব্যবহারে ট্রাম্পের বিশেষ ঝোঁক আগে থেকেই দেখা গেছে। গত শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়।

কারাকাস থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সেনারা তুলে নিয়ে যায়। সমালোচকরা বলছেন, এই ঘটনা জাতিসংঘের সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ, জাতিসংঘের সনদে পরিষ্কার বলা আছে, কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকির সৃষ্টি করা যাবে না।

ভেনেজুয়েলায় এই হামলার পর ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব যেন আরও বেড়ে গেছে। অথচ মাত্র এক মাস আগেই তিনি প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত ‍‍`ফিফা শান্তি পুরস্কার‍‍` লাভ করেছিলেন। শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পরপরই একটি স্বাধীন দেশে মার্কিন হামলা ও রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে।

ভেনেজুয়েলায় হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রই দেশটি ‍‍`পরিচালনা‍‍` করবে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য জানিয়েছে, তারা দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। তবে আদতে এই সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ‍‍`ইশারাতেই‍‍` চালাতে চায়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ওয়াশিংটনই চূড়ান্ত ‍‍`নির্দেশ‍‍` দেবে।

এখানেই শেষ নয়, ওয়াশিংটনের কোনো দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানালে আবারও সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার সতর্ক করে বলছে, তাদের নির্দেশ অমান্য করা হলে ভেনেজুয়েলায় ‍‍`দ্বিতীয় দফায়‍‍` বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে।

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে বিশ্ব আবার ‍‍`সাম্রাজ্যবাদের যুগে‍‍` ফিরে যাচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মার্গারেট স্যাটারথওয়েট। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইনকে এভাবে দুর্বল করার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে একই ধরনের আগ্রাসন চালাতে উৎসাহিত করা।

আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্যাটারথওয়েট বলেন, "কোনো রাষ্ট্র যদি খারাপ কিছু করতে বদ্ধপরিকর হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন তাদের থামাতে পারে না।" গাজা উপত্যকায় সাম্প্রতিক নৃশংসতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অনেক দেশ ও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে চেষ্টা করেও সেখানে সহিংসতা থামানো সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, "বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ওপর আমরা যদি জোর না দিই, তবে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আমরা আসলে এক গভীর খাদের দিকে এগিয়ে যাব।"

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইউসরা সুয়েদি। ‍‍`জোর যার মুল্লুক তার‍‍` নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতা সম্পর্কে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

সুয়েদি বলেন, "এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি সংকেত। এর ফলে অন্যান্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটার সুযোগ পাবে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রকে দেখে চীন হয়তো তাইওয়ানের ওপর এবং রাশিয়া ইউক্রেন বিষয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।"

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন যদি বৈশ্বিক নিয়মকানুনকে তোয়াক্কা না করে পেশিবল খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তবে বিশ্বের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে।

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ইতিহাস এবং এর ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হার্ড মনে করেন, এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাস মোটেও সুখকর নয়।

গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র হয় সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়েছে, অথবা সামরিক অভ্যুত্থানে মদত দিয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ তৈরি করেছে।

অধ্যাপক হার্ড আল-জাজিরাকে বলেন, "ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। সত্তর দশকের চিলি থেকে শুরু করে পানামা, হাইতি কিংবা নিকারাগুয়া—সবখানেই যুক্তরাষ্ট্র একই কাজ করেছে।" তিনি মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের বর্তমান পদক্ষেপগুলো আসলে সেই পুরোনো মার্কিন নীতিরই প্রতিফলন, যেখানে ওয়াশিংটন ঠিক করে দিতে চায় অন্য দেশগুলো কীভাবে চলবে।

তবে অতীতের এসব হস্তক্ষেপের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, "পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তের জন্য পরে অনুতপ্ত হয়েছে। কারণ এ ধরনের আগ্রাসন কখনোই ভালো কোনো ফল বয়ে আনে না।"

Link copied!