বুধবার, ০৭ জানুয়ারি, ২০২৬

মাদুরোকে আটকের পর ভেনিজুয়েলায় ঝুঁকিতে চীনের ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশটিতে চীনের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও জ্বালানিভিত্তিক বিনিয়োগ বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

মাদুরোকে আটকের পর ভেনিজুয়েলায় ঝুঁকিতে চীনের ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ

ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলেছে চীনকে। গত কয়েক দশকে ভেনিজুয়েলায় চীনের ঋণ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই জ্বালানিভিত্তিক অর্থনৈতিক চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মাদুরোকে বন্দি করে তুলে নেয়ার পর দেশটির জ্বালানি খাত পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগকে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের কয়েক ঘণ্টা আগেও মাদুরোর সঙ্গে বৈঠকে বসেন চীনের লাতিন আমেরিকাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি চিউ শাওচি। মাদুরোকে বন্দি করার ঘটনায় বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন। চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘ সনদের নীতি অনুসরণ করতে এবং অন্য দেশের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতায় হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে দ্রুত মাদুরোকে মুক্তি দিয়ে ভেনিজুয়েলায় ফেরত পাঠানোর আহ্বানও জানিয়েছে বেইজিং। বেইজিংয়ের এ প্রতিক্রিয়া কেবল কূটনৈতিক অবস্থান নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহনির্ভর ঋণ চুক্তি এবং লাতিন আমেরিকায় চীনের কৌশলগত উপস্থিতি রক্ষার উদ্বেগ।

ভেনিজুয়েলার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয় হুগো শাভেজের সময়। তার ‘পেট্রো-সোশ্যালিজম’ নীতির অধীনে জ্বালানির রাজস্ব বাড়তে থাকলে দেশটি অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, শিল্প ও সামাজিক খাতে ব্যাপক বিদেশী অর্থায়ন খুঁজতে থাকে। সেখানেই বড় অংশীদার হয়ে ওঠে চীন। তখনকার চুক্তিতে ভেনিজুয়েলা প্রতিদিন এক মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি চীনে রফতানির অঙ্গীকার করে। তার বিপরীতে বেইজিং থেকে ঋণ, উন্নয়ন সহায়তা ও বিনিয়োগ পায়। একই সময়ে চীনের অর্থনীতি দ্রুত শিল্পোৎপাদনভিত্তিক হয়ে ওঠায় জ্বালানিতে দেশটি নিট আমদানিকারকে পরিণত হয়। ভেনিজুয়েলার মতো জ্বালানিসমৃদ্ধ অর্থনীতি তার জন্য হয়ে দাঁড়ায় কৌশলগত সরবরাহকারী।

এ অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা লাতিন আমেরিকাজুড়ে চীনের উপস্থিতি বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০০২ সালে যেখানে চীন ও লাতিন আমেরিকার মোট বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, তা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪৯ বিলিয়ন ডলারে। এ অঞ্চলের দেশগুলো মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ, তামা, আকরিক লোহা, সয়াবিন ও জ্বালানি রফতানি করে। আর চীন রফতানি করে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও শিল্পজাত পণ্য। একই সঙ্গে বেইজিং বন্দর, রেলপথ, সড়ক, জ্বালানি ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রকল্পে বড় অংকের অর্থায়ন করে।

২০১৪ সালের পর বৈশ্বিক জ্বালানির দামে ধস নামলে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি দ্রুত সংকটে পড়ে এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোর শাসনামলে সে সংকট আরো তীব্র হয়। জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি আয়ের বড় উৎস হারায়, উৎপাদন কমতে থাকে। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ‘পেত্রোলিওস দে ভেনিজুয়েলা, এসএ’ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে চীন ভেনিজুয়েলাকে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়, যার জামানতও ছিল জ্বালানি রফতানি। ২০১৫ সালে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পুনর্গঠন করা হয়, জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ কমানো হয় এবং আংশিকভাবে স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়। এরপর ২০১৬ সাল থেকে নতুন ঋণ দেয়ার বদলে চীন মূলত পুরনো ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দেয়।

ভেনিজুয়েলায় চীনের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘ঋণের বিনিময়ে জ্বলানি’ মডেল। যেখানে ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করার প্রধান উপায় হয় জ্বালানি সরবরাহ। কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস, জ্বালানি খাতে দুর্বলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট এ মডেলকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ জ্বালানি রফতানি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে বাধা তৈরি করে। ফলে চীনা ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সতর্ক অবস্থানে যেতে শুরু করে।

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং মাদুরোকে আটক করার বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নতুন সরকার চীনের সঙ্গে করা চুক্তি বহাল রাখবে, নাকি সেগুলো পুনর্বিবেচনা করবে—এ প্রশ্ন এখন বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভেনিজুয়েলা এখনো চীনের অন্যতম বড় ঋণগ্রহীতা দেশ। সেখানে আর্থিক অস্থিতিশীলতা কোনো দায় পরিশোধে ব্যর্থতা বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতা চলছে, ভেনিজুয়েলা তার একটি বড় পরীক্ষা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বেইজিংয়ের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার বিষয়ও। আর ওয়াশিংটনের কাছে বিষয়টি হচ্ছে নিজস্ব প্রভাববলয় পুনর্গঠন ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অর্থনৈতিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার না হলে জ্বালানি উৎপাদন বাড়বে না। উৎপাদন না বাড়লে চুক্তিভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহও টেকসই হবে না। এর মানে চীনের বহু বছরের বিনিয়োগ ও ঋণ এখন বাস্তব ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মাদুরোর পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং নতুন প্রশাসনের বৈদেশিক নীতি—এ তিনটি উপাদান নির্ধারণ করবে চীনের ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক স্বার্থ কতটা নিরাপদ থাকবে, নাকি এটি পরিণত হবে চীনের সবচেয়ে বড় ঋণ ঝুঁকিতে।

Link copied!