প্রকাশিত: : মার্চ ১৬, ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম
ঈদ ঘনিয়ে এলেও দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ শিল্পকারখানায় এখনো ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ হয়নি এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানে বোনাসও বাকি রয়েছে, এতে শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে; যদিও মালিকপক্ষ দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে।
ঈদ ঘনিয়ে এলেও বেতন-বোনাস বকেয়া
শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, কিছু মালিক ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করেন না। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দাবি, অধিকাংশ কারখানাই ইতিমধ্যে গত মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে এবং আগামী বুধবারের মধ্যে বোনাস দেওয়ার পর ছুটি ঘোষণা করা হবে।
শিল্প পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকা দেশের ১০, ১০০টি শিল্পকারখানার তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত ৬৮৩৪টি কারখানা (প্রায় ৬৮%) ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে। অপরদিকে ৩২৬৬টি কারখানায় (৩২%) এখনো বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। যেসব কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন বাকি রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ৭১৮টি পোশাক কারখানা, ১৫৮টি বস্ত্রকল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের ১০টি কারখানা, ৪টি পাটকল এবং অন্যান্য খাতের ২৩৭৬টি প্রতিষ্ঠান।
বোনাস পেয়েছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কারখানার শ্রমিক
ঈদ বোনাসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ১০, ১০০টি শিল্পকারখানার মধ্যে রোববার পর্যন্ত মাত্র ৩৬৯২টি প্রতিষ্ঠান (প্রায় ৩৬.৫%) শ্রমিকদের বোনাস দিয়েছে। অন্যদিকে ৬৪০৮টি প্রতিষ্ঠান (প্রায় ৬৩%) এখনো বোনাস পরিশোধ করেনি।
৩ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ৯৪তম সভা এবং তৈরি পোশাক খাতবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ২৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নির্দেশ দেন, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ৯ মার্চের মধ্যে এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
ঋণসুবিধা দিলেও বেতন পাননি শ্রমিকেরা
এর আগে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঈদের আগে দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দেয়, সচল রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য এক মাসের সমপরিমাণ বিশেষ ঋণ সুবিধা পাবে। পাশাপাশি চলতি মাসে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের ২৫০০ কোটি টাকার বকেয়া নগদ সহায়তাও ছাড় করা হয়।
বেতন-বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ শ্রমিকদের
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের আগে বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দেখা গেছে। ৯ মার্চ ময়মনসিংহের ভালুকায় রাসেল অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। একইভাবে গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার গাবতলী এলাকায় সেঞ্চুরি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বকেয়া বেতন, ওভারটাইমের মজুরি ও বোনাসের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
দ্রুত পরিশোধে মালিকদের আশ্বাস
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, তাদের সদস্য ৮৩২টি সচল কারখানার মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান এক মাসের বেতন দেওয়ার জন্য ঋণ নিয়েছে। এখনো প্রায় ৩০% থেকে ৩৫% কারখানা শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেনি এবং অর্ধেকের কম কারখানা বোনাস দিয়েছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে এখনো বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়নি। তবে কিছু কারখানা ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অধিকাংশ কারখানা বৃহস্পতিবারের মধ্যে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করে ছুটি ঘোষণা করবে।
অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিজিএমইএর সদস্য ২১২৭টি সচল কারখানার মধ্যে রোববার পর্যন্ত ২০৪৬টি কারখানা ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দিয়েছে। অর্থাৎ এখনো ৮১টি কারখানায় বেতন বাকি রয়েছে। এ ছাড়া ১৮৮০টি কারখানা ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে। জানুয়ারি মাসের বেতন এখনো ৫টি কারখানায় বকেয়া রয়েছে এবং চলতি মাসের বেতনের আংশিক অগ্রিম দিয়েছে ৯টি কারখানা।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রতি মাসেই কিছু নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানা সময়মতো বেতন পরিশোধ করতে পারে না। এবারও সেই প্রবণতা কিছুটা দেখা যাচ্ছে। তবে অধিকাংশ কারখানা বেতন দিয়েছে এবং বাকি থাকা ৮১টি কারখানাও আগামী তিন দিনের মধ্যে বেতন পরিশোধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভিযোগ শ্রমিকনেতাদের
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, কিছু মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেতন-ভাতা আটকে রাখেন, যার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। তাঁর মতে, সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিলে প্রতিবছর ঈদের আগে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।