মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ ডোনাল্ড ট্রাম্প: দ্য ইকোনোমিস্ট

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০২:৩৩ এএম

সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত, তবে এই সংঘাতে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প—যেখানে সামরিক শক্তি নয়, সীমাবদ্ধতাই বেশি স্পষ্ট হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ  ডোনাল্ড ট্রাম্প: দ্য ইকোনোমিস্ট

সব যুদ্ধে বিজয়ী থাকে না, তবে অন্তত একটি পক্ষ পরাজিত হয়। আর যদি এই যুদ্ধবিরতিই ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় পরাজিত ব্যক্তি হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাত তার প্রধান লক্ষ্যগুলো থেকে তাকে পিছিয়ে দিয়েছে এবং মার্কিন শক্তি প্রয়োগ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে।  এদিকে লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির আওতায় আনা হবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একমত হতে পারেনি। একই সময়ে ইসরায়েল সেখানে তীব্র হামলা চালাচ্ছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বশর্তগুলোর একটি ছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। কিন্তু এটি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এমনকি আলোচ্য বিষয়গুলো এতটাই দূরে যে এই সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে কী নিয়ে আলোচনা হবে, তা নিয়েও পূর্ণ ঐকমত্য হয়নি।

ট্রাম্প আবার যুদ্ধে ফিরবেন কি না- এ প্রশ্নের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তিনি এখন বুঝতে পারছেন এই যুদ্ধ শুরু করাই উচিত হয়নি। তার আগের কঠোর বক্তব্যকে অনেকেই এখন পিছুটান আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার যে দাবি তিনি করেছিলেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

ইরানের পক্ষেও পরিস্থিতি কঠিন। তাদের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষতি দেশ পরিচালনাকে আরও কঠিন করেছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও তাদের একটি লক্ষ্য। তারা মনে করছে, সময় তাদের পক্ষে কাজ করতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় সামরিক চাপ বজায় রাখতে পারবে না।

ফলে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হিসেবে ধরা হচ্ছে, আহত একটি ইরানি শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় টিকে থাকবে এবং আলোচনায় সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে। ইরানের নৌ ও বিমান সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নষ্ট হয়েছে বা ব্যবহৃত হয়েছে। এসব পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

যদিও ট্রাম্প এটিকে বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন, কিন্তু ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর ভিত্তিতে তা পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপদ করা, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে আটকানো।

এই যুদ্ধ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করেছে। এরপর তারা এই প্রণালি ব্যবহারে টোল দাবি করার কথাও তুলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এমনকি রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয় নিয়েও ভাবছে। তবে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বিকল্প রুট ও পাইপলাইন বিবেচনা করলেও ইরান গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তাদের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে- যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা, নিজস্ব প্রতিরক্ষা, বা ইরানের সঙ্গে সমঝোতা—সবই আলোচনায় রয়েছে। যুদ্ধের আগে ইরানি শাসনব্যবস্থা অজনপ্রিয়তার মুখে ছিল এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে বলে বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্র এখন আরও কঠোর নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে ঝুঁকেছে।

এছাড়া পারমাণবিক ইস্যুও আরও জটিল হয়েছে। অবকাঠামোর ক্ষতি হলেও বিপুল পরিমাণ উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো সংরক্ষিত আছে। ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানকে এই পারমাণবিক সক্ষমতা ছাড়তে হবে। তবে বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, চাপের ফলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আগ্রহ আরও বাড়তে পারে, যা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করবে।

ইসরায়েল সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও এই যুদ্ধ তাদের সীমাবদ্ধতা ও আঞ্চলিক বিরূপ প্রতিক্রিয়াও সামনে এনেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ শক্তি প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে।

যুদ্ধটি দেখিয়েছে যে সামরিক শক্তি থাকলেও তা সব সময় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট নয়। দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ অনেক সময় কৌশলগত জটিলতা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ফলাফল নিশ্চিত করতে পারে না।

Link copied!