প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা—পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও অপ্রত্যাশিত কৌশলে এমনকি তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও বুঝতে পারছেন না, ঠিক কোন পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথায় ঠিক কী চলছে, তা নিয়ে নিশ্চিত নন তার নিজের দলের সদস্যেরাই। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করেন, এই ধোঁয়াশা আসলে ট্রাম্প ইচ্ছা করেই তৈরি করেছেন।
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প বারবার পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়েছেন। ফলে এই সংঘাত কোন পথে মোড় নেবে, তা নিয়ে জনমানসে প্রশ্ন দানা বেঁধেছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিয়স-এর রিপোর্ট বলছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা খোদ তার উপদেষ্টাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। এক সূত্রের দাবি, `শেষপর্যন্ত তিনি ঠিক কী ভাবছেন, তা আদতে কেউই জানে না।`
তবে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের দাবি, এই বিভ্রান্তি ট্রাম্পের কৌশলেরই অংশ। অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেন, `পরিকল্পনাটাই এমন, যাতে আপনাদের কাছে কোনো সূত্র না থাকে।`
ট্রাম্প প্রশাসনের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, `এটা কেবল ত্রিমাত্রিক দাবা খেলা নয়, এ হলো বারো-মাত্রার খেলা। তিনি নিয়মিত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেন। তাই কারোর পক্ষেই তার চিন্তাভাবনা বোঝা সম্ভব নয়। কাজটা তিনি ইচ্ছা করেই করেন।`
অ্যাক্সিওসকে একাধিক সূত্র বলেছে, ট্রাম্প পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি হাতের কাছে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তুত রাখতে পছন্দ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে সুযোগ লুফে নেন।
সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, `প্রথম সপ্তাহের জন্য ওদের পরিকল্পনা ছিল। তারপর থেকে যা হচ্ছে, সবই হাওয়া বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে ঠিক করা হচ্ছে।`
জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্পের কিছু লক্ষ্য রয়েছে এবং মার্কিন সেনাবাহিনী সেই উদ্দেশ্যপূরণে সফলভাবে এগিয়ে চলেছে।
ওই কর্মকর্তা ইন্ডিপেনডেন্টের কাছে দাবি করেন, অপারেশন এপিক ফিউরি-র অধীনে চারটি প্রধান লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট— ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সক্ষমতা ধ্বংস করা, দেশটির নৌবাহিনী ধ্বংস, ইরানের সব প্রক্সিকে নির্মূল, এবং তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
ইরানে এবার স্থল হামলা চালানো হবে কি না—এই জল্পনা যখন তুঙ্গে, তখনই মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ওয়াশিংটন চায় তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শত্রুপক্ষের কাছে `অপ্রত্যাশিত` থাকে। তিনি বলেন, `আমরা কী করতে চলেছি বা কী করব না, তা যেন কেউ আগে থেকে আঁচ করতে না পারে।`
তবে অ্যাক্সিওসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে স্থলসেনা পাঠানোর বিরোধী। ওই উপদেষ্টার দাবি, `ট্রাম্প যখন কোনো কাজ করতে চান না, তখন তা এড়াতে তিনি অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারেন। তবে তার চিন্তা আগে থেকেই ধারণা করে ফেলেছেন—এমন ধারণা করা হবে মস্ত বড় ভুল।`
মঙ্গলবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশা করছেন এই সামরিক অভিযান `দুই থেকে তিন সপ্তাহের` মধ্যেই শেষ হবে। তবে একজন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, ট্রাম্প আগেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন যে প্রয়োজনে মার্কিন বাহিনীকে আবারও ইরানে ফিরতে হতে পারে।
এরই মধ্যে বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রকে `যুদ্ধবিরতি`র প্রস্তাব দিয়েছেন। ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি লেখেন, `হরমুজ প্রণালি যখন পুরোপুরি অবাধ ও নিরাপদ হবে, তখনই আমরা এই প্রস্তাব বিবেচনা করব। ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার প্রক্রিয়া চলবে। যাকে বলে, আক্ষরিক অর্থেই ওদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া হবে!`
এরই মধ্যে যুদ্ধের `অন্যতম প্রধান কারণ` নিয়েও নাটকীয়ভাবে নিজের অবস্থান বদলেছেন ট্রাম্প। বুধবার পর্যন্তও তিনি বলে আসছিলেন, এই আগ্রাসনের মূল লক্ষ্য ইরান সরকারের পতন ঘটানো ও দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলের পরিকল্পনাও ছিল তার। বিভিন্ন সময় প্রমাণ ছাড়াই বলে এসেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি চলে গেছে।
কিন্তু বুধবার রয়টার্সের পক্ষ থেকে ইউরেনিয়াম মজুত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, `সেগুলো মাটির অনেক গভীরে রয়েছে, ওটা নিয়ে আমার আর মাথাব্যথা নেই। আমরা সবসময় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেটির ওপর নজর রাখব।`