প্রকাশিত: : মে ১৯, ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিতে চালু করা `স্কুল ফিডিং প্রকল্প` এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে শিশুদের ফাঙ্গাসযুক্ত বাসি রুটি, পচা ডিম আর কাঁচা কলা দেওয়ার অভিযোগ এসেছে।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের (যমুনা টেলিভিশন) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে সপ্তাহে অন্তত ১৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র। এসব পচা ও বাসি খাবার খেয়ে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন শতাধিক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে দেশের প্রায় ১৫০টি উপজেলায় এই প্রকল্প চালু হয়। প্রতিদিন প্রায় ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বরাদ্দের আড়ালেই চলছে বিশাল জালিয়াতি:
বানরুটিতে ফাঙ্গাস ও দুর্গন্ধ: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপশাড়া ও তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেওয়া বানরুটিতে ফাঙ্গাস ও দুর্গন্ধ পাওয়া গেছে। ১২০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি রুটির দাম ২৪ টাকা ধরা হলেও, ওজন ঠিক রাখতে রুটি ভিজিয়ে সরবরাহ করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ডিমের ওজনে চুরি ও পচা ডিম: নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের ওজন কমপক্ষে ৬০ গ্রাম এবং দাম ১৪ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু দেওয়া হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ গ্রামের ডিম। অনেক ক্ষেত্রে ডিম ঠিকমতো সেদ্ধ করা হয় না এবং পচা থাকে। প্রতিদিন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ডিমে মাত্র এক টাকা করে কমালেও সপ্তাহে কোটি টাকা গায়েব হয়ে যাচ্ছে।
কলায় আকাশপাতাল ফারাক: চুক্তিতে ১০০ গ্রাম ওজনের কলার দাম সাড়ে ১০ টাকা ধরা হলেও, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দেওয়া হচ্ছে ৯০ গ্রামের কলা। উত্তরাঞ্চলের দুর্গাদহ বাজারে যে কলার দাম ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা, সেটিই প্রকল্পে ১০.৫ টাকায় দেখিয়ে সপ্তাহে প্রায় দুই কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে।
নিম্নমানের এই খাবার খেয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে কোমলমতি শিশুরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শঙ্করবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ২২ এপ্রিল পাউরুটি খেয়ে একসঙ্গে ২০ জন শিক্ষার্থী পেটব্যথা ও বমিতে আক্রান্ত হয়।
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে দুই দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল শিশু রাইসা মুনতাহা। সে জানায়, খাবার খাওয়ার পর তার পেটব্যথা শুরু হয়। তার মা জান্নাতুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বিষাক্ত খাবার দিয়ে আমার লাভ কী? বাচ্চাদের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমাকে বাচ্চা কে ফিরিয়ে দেবে?"
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ এই ঘটনাকে শিশুদের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ উল্লেখ করে বলেন, "খাবারের উপাদানগুলো ক্ষতিকর হলে তা শিশুদের লিভারের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। বাসি বা পচা খাবার থেকে ডায়রিয়া, জন্ডিস এবং হেপাটাইটিস-এ ও ই এর মতো মারাত্মক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।"
রাজশাহী বিভাগের ১২টি উপজেলায় খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা `গণউন্নয়ন সংস্থা গাক`-এর এক প্রতিনিধি পচা ডিমের বিষয়ে খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বলেন, "২২ হাজার ডিম কি একটি একটি করে চেক করে দেওয়া সম্ভব?"
তবে, প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, শিশুদের খাবারের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং অভিযুক্ত ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নজরে আনা হলে তিনি জানান, খাবারের মান নিশ্চিতে এখন থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটিকে `খাবার কমিটির` দায়িত্বে রাখা হবে।
উল্লেখ্য, সরকার ভবিষ্যতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বর্তমান প্রকল্পের এই ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র আগামী দিনে পুরো উদ্যোগটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।