প্রকাশিত: : এপ্রিল ৫, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
আসন্ন গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। সময়মতো এই অর্থ না পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় সরকারকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ১২ টাকা ১৫ পয়সা, অথচ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে তা বিক্রি করছে ৭ টাকা ৪ পয়সায়। ফলে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ২৭ পয়সা লোকসান হচ্ছে, যা ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভর্তুকির এই উচ্চ চাহিদার পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পরিকল্পনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের বড় অংশের ভর্তুকি যায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর `ক্যাপাসিটি চার্জ` বা কেন্দ্র ভাড়ায়। ওই সময়ে চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালসহ এসব কেন্দ্রের অনেকগুলো বছরজুড়ে অলস থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়। তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি (৫.০২ টাকা থেকে ১৫.৫০ টাকা) এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং গ্রিডে যুক্ত নতুন তিনটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে গত ১৬ মার্চ বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ বিভাগে ভর্তুকির চাহিদাপত্র পাঠায়। মার্চ থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য এই অর্থ চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। এগুলো হলো— শ্রীপুর ১৬০ মেগাওয়াট এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ তিনটি কেন্দ্রের জন্য মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন। এ ছাড়া ভারত থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির বিল পরিশোধে ৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা এবং সরকারি কোম্পানি ও বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৩ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে। আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার চলতি বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ভর্তুকির বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন-১) মো. সোলায়মান বলেন, `ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠানোর পর অর্থ বিভাগ থেকে এখনও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এই অর্থ ছাড় না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব পড়বে।` জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন অধ্যাপক ইজাজ হোসেইন বলেন, `বিদ্যুৎ খাতে এই ভর্তুকির বড় অংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনার ফল। তারা কয়েক মাস পরপর দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয়ের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। এখন পরিস্থিতি এমন যে, দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি সামলানো কঠিন। সরকার এখনই দাম বাড়াতে চায় না, তবে বাস্তবতা বলছে এটি প্রয়োজন।`