বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬

ইরান যু*দ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : এপ্রিল ১, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার নিয়েছে; সীমিত মজুদ, রেশনিং এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ইরান যু*দ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য সাজিদ আলীকে প্রতিদিন ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু তার মোটরবাইকের জন্য প্রয়োজনীয় অকটেন সংগ্রহ করতে এখন তাকে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান অভিযানের জেরে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সাজিদের মতো লাখো মানুষ এখন দিন-রাত পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে ভিড় করছেন।

৩৩ বছর বয়সী এই বেসরকারি চাকুরিজীবী ‍‍`দ্য ইনডিপেনডেন্ট‍‍`-কে বলেন, ‍‍`যাতায়াতের জন্য এই মোটরসাইকেলই আমার একমাত্র ভরসা। কিন্তু অকটেন না পেলে আমি চলব কীভাবে?‍‍`

তিনি আরও যোগ করেন, ‍‍`আমি ভাগ্যবান যে তেল পেয়েছি। আমার পেছনে থাকা ডজনখানেক চালককে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে কারণ পাম্পের তেল শেষ হয়ে গিয়েছিল।‍‍` যানজটের জন্য পরিচিত ঢাকা শহরের রাস্তায় এখন যানবাহনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অধিকাংশ জাহাজের জন্য বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।

উল্লেখ্য, এশিয়ার দেশগুলোর আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে চরম বিঘ্ন ঘটায় দেশটিতে বর্তমানে যানবাহনের জ্বালানি রেশনিং এবং ডিজেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

রয়টার্সের তথ্যমতে, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা সামান্য পরিমাণ জ্বালানির আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি সারারাত অপেক্ষা করছেন। অনেক ফিলিং স্টেশন তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে গেট বন্ধ করে দিয়েছে। সরবরাহ সংকটের ভয়াবহতা এতটাই যে, জ্বালানি সরবরাহকারী মেশিনগুলো নীল প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে সংকট আরও প্রকট। সেখানে প্লাস্টিকের বোতলে এক বা দুই লিটার তেল চড়া দামে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে।

জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপের মুখে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। বৈশ্বিক এই জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশই প্রথম দেশ হতে পারে যার জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মাত্র ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ ছিল, যা দিয়ে বড়জোর দুই সপ্তাহ চলা সম্ভব। ডিজেলের মজুদও প্রায় একই অবস্থায়। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা এখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে উৎস বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে। এছাড়া ভারতের মতো বিশেষ সুবিধা চেয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের আবেদন করেছে বাংলাদেশ।তারেক রহমান সরকারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‍‍`দ্য ইনডিপেনডেন্ট‍‍`-কে বলেন, ‍‍`পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে গিয়ে আমাদের কোষাগার শূন্য হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সরকারের কিছু করার নেই। আমাদের হাতে ১০ দিনেরও কম মজুদ আছে।‍‍`

ঘরোয়া গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে। গত বুধবার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা পেট্রোবাংলা দুই কার্গো এলএনজি সংগ্রহ করেছে, যার দাম ১ মার্চের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি।

রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বর্তমানে তিনজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল নিচ্ছে এবং এ মাসের শেষের দিকে আরও ৯০ হাজার মেট্রিক টন আসার কথা রয়েছে।

গ্লোবাল থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‍‍`ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস‍‍`-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‍‍`আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় এশিয়ায় বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।‍‍`

ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‍‍`দ্য টেলিগ্রাফ‍‍` এক বাংলাদেশি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।

তবে দেশের জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‍‍`আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। প্রকৃতপক্ষে, গত বছরের তুলনায় আমরা সরবরাহ বাড়িয়েছি।‍‍`

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই সংকটের জন্য অবৈধ সিন্ডিকেটকেও দায়ী করছেন, যারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় আতঙ্কিত হয়ে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত জ্বালানি মজুদ করতে শুরু করায় সংকট আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, ‍‍`আমরা সীমিত সরবরাহ পাচ্ছি এবং পাম্পগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পাম্পগুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। অক্টেন বা পেট্রোল না পেয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হাতে আমাদের কর্মীরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। মানুষের উচিত তেল মজুদ করা বন্ধ করা।‍‍`

তিনি আরও জানান, অনেক মোটরসাইকেল চালক একবার ট্যাংক পূর্ণ করে আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। পাম্প ও কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তারা।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের এসি ও লাইট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রেশনিং ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল।

‍‍`দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড‍‍`-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ টন (৯ দিনের চাহিদা) এবং অক্টেনের মজুদ ছিল ২৮ হাজার ১৫২ টন (২ সপ্তাহের চাহিদা)। এপ্রিলে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে বিপিসি-র। এছাড়া জ্বালানি আমদানির সহায়তায় বাংলাদেশ আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক অর্থায়ন খুঁজছে।বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‍‍`সরকার অত্যন্ত উচ্চমূল্যে তেল ও জ্বালানি আমদানি করছে। এতে (সরকারের ওপর) ভর্তুকির বোঝা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।‍‍`

তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ তার প্রাথমিক জ্বালানির ৬২ শতাংশের বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো সিস্টেমের ওপর পড়ে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন, ‍‍`বিদ্যুৎ খাতে এমনিতেই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়; তার ওপর এই চড়া দামের জ্বালানি সরকারের আর্থিক সংস্থানের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।‍‍`

তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে, "কোম্পানিগুলো হয় চড়া দামে জ্বালানি কিনবে, অথবা গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং করবে। যার ফলে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন সংকট দেখা দেবে এবং লোডশেডিং শুরু হবে।‍‍`

জ্বালানি সাশ্রয়ে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‍‍`সরকারের উচিত যথাযথ বার্তার মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর দেওয়া। এক্ষেত্রে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সফলভাবে পরীক্ষিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন—যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সরাসরি আর্থিক লেনদেন করে না, তাদের জন্য বাসা থেকে কাজ করার (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) নির্দেশনা জারি করা।‍‍`

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, সব সংস্থাকে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিন মাসের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এই সংকটে সামনের সারিতে থাকা এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে, বাসা থেকে কাজ করার ব্যবস্থা চালু করেছে এবং কর্মদিবস কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অল্প সময়ে গোসল করার মতো অনুরোধও জানিয়েছে দেশগুলো।

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেই চলতি বছর ক্ষমতায় আসে তারেক রহমানের সরকার। এর কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।

শফিকুল আলম দাবি করেন, ‍‍`২০২২ সালে রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না।‍‍`

২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক চরম সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। এই গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আলম পরামর্শ দেন যে, তারেক রহমানের সরকারের উচিত বর্তমান অবস্থা পুনর্বিবেচনা করা এবং বাংলাদেশের ক্লিন এনার্জিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা।

তিনি আরও বলেন, ‍‍`ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের পর জ্বালানি খাতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই শূন্যস্থানটি আর পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সরকারের উচিত এখনই জ্বালানি খাতের এই রূপান্তর ত্বরান্বিত করা।‍‍`

Link copied!