সোমবার, ০৫ জানুয়ারি, ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সন্ত্রাসে নিহত ২৯৩ জন

টিএনসি ডেস্ক

প্রকাশিত: : জানুয়ারি ৩, ২০২৬, ১১:৪২ এএম

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মতপ্রকাশে দমন–পীড়নে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে; এতে শতাধিক প্রাণহানি ও গণমাধ্যমসহ সংখ্যালঘুদের ওপর বাড়তি সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সন্ত্রাসে নিহত ২৯৩ জন

২০২৫ সালে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আগের বছর একই সময়ে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গতকাল প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, আসকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রস্তুত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। এ সময় নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও বাউল সম্প্রদায়ের সদস্যদের হেনস্তা, মারধর এবং জুতার মালা পরানোর ঘটনাও ঘটেছে।

আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে ঢাকায় ২৭ জন, গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে নয় ও কুমিল্লায় আটজন নিহত হন। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে নিহত হন ছয়জন করে। লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে পাঁচজন করে এবং নরসিংদী ও যশোরে মবের শিকার হয়ে চারজন করে প্রাণ হারান।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গণপিটুনির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত সাতজন, নারী তিনজন এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন, যা সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার অসম প্রভাবকে স্পষ্ট করে। আসক জানায়, রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ মব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ৩৮টি ঘটনার মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, যৌথ বাহিনীর হেফাজত এবং তথাকথিত ‘গুলিতে’ বা বন্দুকযুদ্ধে ২৬ জন নিহত হন। থানায় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১২টি। ২০২৪ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যায় নিহত হয়েছিলেন ২১ জন।

একই বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাজতি ৬৯ ও কয়েদি ৩৮ জন। সর্বোচ্চ ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এতে সাংবাদিক ও কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন এবং পত্রিকা দুটির মুদ্রিত ও অনলাইন সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত।

আসক বলেছে, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ মানবাধিকার। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ ও মামলা-গ্রেফতারের আশঙ্কা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করছে।

আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং প্রায় ৪ হাজার ৮৪৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এদের মধ্যে তিনজন নিহত হন এবং চারজনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার করা হয়।

২০২৫ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বসতঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর ও জমি দখলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় একজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন। একই সময়ে একটি বৌদ্ধ মন্দিরেও হামলার ঘটনা ঘটে।

Link copied!